সম্প্রতি
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি
গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী বক্তব্য তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা
ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর বিশিষ্ট অধ্যাপক ডক্টর মোঃ আব্দুস সালাম। তাঁর সেই সময়োপযোগী
ও বিশ্লেষণাত্মক বক্তব্যটি দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দায়িত্বশীলদের
অতিকথন, শিক্ষা ব্যবস্থার মনস্তাত্ত্বিক সংকট এবং চলমান বন্যা-জলাবদ্ধতার মতো মানবিক
বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে তাঁর মতামতটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:অতিকথন ও দায়িত্বশীলতার সংকটসম্প্রতি
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দুঃখ প্রকাশকে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে
দেখছেন অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুস সালাম। তবে একই সাথে তিনি সতর্ক করে বলেন, "দায়িত্বশীল
পদে থাকা অবস্থায় অতিকথন সব সময় বিপজ্জনক!"তাঁর
মতে, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বয়সের কারণে ইমম্যাচিউর (অপরিণত) হতেই পারে এবং তারা নানা
রকমের অযৌক্তিক ও আবেগিক দাবিও করতে পারে। কিন্তু সেই দাবিগুলোকে দক্ষতার সাথে ব্যবস্থাপনা
করাই হচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মূল দায়িত্ব। চটজলদি বা হঠকারী মন্তব্য পরিস্থিতিকে
আরও জটিল করে তোলে।প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রের
সমীকরণদেশ
এখন এক অমানবিক ও সংকটাপন্ন পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বন্যা পরিস্থিতি
এবং অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা প্রায় সারাদেশেই জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
এই মানবিক বিপর্যয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো মন্তব্য করা সমীচীন বলে তিনি মনে করেন।এবারের
এইচএসসি পরীক্ষার একটি বিশেষ দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এবারই প্রথম দেশে অভিন্ন
প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সে কারণে একটা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত
রেখে অন্যান্য বোর্ডে পরীক্ষা পরিচালনা করা কতটা যৌক্তিক?"তিনি
যৌক্তিক প্রশ্ন তোলেন যে, স্থগিত হওয়া বোর্ডের পরীক্ষা যখন পুনরায় নেওয়া হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই
প্রশ্নপত্র ভিন্ন হতে বাধ্য। আর দুটি ভিন্ন প্রশ্নপত্রের কাঠিন্যের মাত্রা
(Difficulty Level) কখনো এক হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বৈষম্য তৈরি হওয়ার
একটি বড় সুযোগ থেকে যায়। শিক্ষা নিয়ে যেকোনো মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে
তাই আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।শিক্ষার্থীদের মনোজাগতিক পরিবর্তন ও বিগত
দিনের ভুল নীতিআন্দোলনকারী
শিক্ষার্থীদের কিছু দাবিকে 'একেবারেই অযৌক্তিক' আখ্যা দিয়ে অধ্যাপক সালাম বলেন, এই
বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ম্যানেজ করা উচিত। শিক্ষার্থীদের বোঝানোর জন্য প্রয়োজনে
বিভিন্ন মিডিয়া ব্যবহার করে কাউন্সেলিং করা এবং মনস্তাত্ত্বিক সচেতনতা তৈরি করা এখন
সময়ের দাবি।বর্তমান
প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মনোজগতে যে নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে বিগত বছরগুলোর
কিছু ত্রুটিপূর্ণ নীতিকে দায়ী করেছেন এই শিক্ষাবিদ। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে:·
অটো পাস: পরীক্ষা না
দিয়েই পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি।·
সংক্ষিপ্ত সিলেবাস:
পড়াশোনার পরিধি কমিয়ে আনা।·
অতিরিক্ত নম্বর ও গ্রেড
প্রদান: মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কৃত্রিম উদারতা।·
শতভাগ পাস করানোর প্রবণতা:
গুণগত মান বাদ দিয়ে সংখ্যার পেছনে ছোটা।এই
বিষয়গুলোই শিক্ষার্থীদের মাথায় অযৌক্তিক প্রত্যাশা ও দাবি ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে
আমাদের শিক্ষার গুণগত মানের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা ও সুযোগ
সন্ধানীদের তৎপরতাদেশ
অল্প কিছুদিন আগেই একটি বড় গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখীন হয়েছে। সেই ক্ষতচিহ্ন এখনও শুকায়নি।
এই নাজুক পরিস্থিতিতে সমাজে উস্কানি দেওয়ার মতো লোকের অভাব নেই উল্লেখ করে তিনি বর্তমান
গণতান্ত্রিক সরকারকে এ বিষয়ে কড়া নজর রাখার আহ্বান জানান। নতুবা দেশ আবারও বড় ধরনের
সংকটকালীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।সমাপনী আহ্বান: শিক্ষা খাতের সংবেদনশীলতাবক্তব্যের
শেষাংশে অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুস সালাম শিক্ষা খাতকে দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সেক্টর
হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ, এর সাথে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং
সাধারণ মানুষ সরাসরি যুক্ত। এখানে যেকোনো নেতিবাচক মন্তব্য দাবানলের মতো দ্রুত ছড়িয়ে
পড়ে।তাই
দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যেকোনো অপ্রয়োজনীয় ও নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত
থাকার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ জানান। অন্যথায়, এই সংবেদনশীল শিক্ষা
ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ আবারও কোনো সুযোগ সন্ধানী মহলের কবলে পড়ে যেতে পারে
বলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ